Breaking News

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নাকি কন্ঠরোধ করে ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধি অথবা ছোট সংবাদ সংস্থাগুলির সাহস আর কলমের জোর – কলম ধরলেন শৌভিক দত্ত

গতকাল ছিল world press freedom day‚ বিশ্ব সংবাদপত্র স্বাধীনতা দিবস। সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম গনতন্ত্রটির নাগরিকদের কাছে হয়তো এখনো অজানা থেকে গেছে গনতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের জন্যে বরাদ্দ এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটি।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মুক্ত মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান জানানো ও অন্যদের এই অধিকারের কথা মনে করিয়ে দেওয়াই হলো এই দিনটির প্রধান লক্ষ্য। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংবাদমাধ্যমের সেইসব কর্মীদের আত্মবলিদানের কথা যারা এই বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন।

১৯৮৬ সালে মাদক ব্যাবসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে খুন হন কলম্বিয়ার সাংবাদিক গুইলারমো ক্যানো। তাঁরই স্মৃতিতে ১৯৯৩ থেকে রাষ্ট্রসংঘ এই পুরষ্কার দিয়ে আসছে সংবাদমাধ্যমের অধিকারের জন্যে লড়া কর্মীদের‚ বিশেষত যারা এই লক্ষ্যে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে‚ তাদের।

ভারতে তো তো অবশ্যই‚ সম্পূর্ণ পৃথিবীতেই আজ সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন‚ বিভিন্ন প্রভাবশালী মাধ্যমের চাপ‚ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা‚ অর্থনৈতিক সংকট আবার এমনকি কিছু অসাধু সংবাদমাধ্যমের হলুদ সাংবাদিকতার জন্যেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দুইই আজ পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে।

বিশ্বের ১৮০টি দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ) সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করেছে। এই সূচক স্পষ্ট ইংগিত করে যে সারা পৃথিবীতেই সংবাদমাধ্যম জন্যে এক বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। হয়তোবা ভবিষ্যতে তাদের জন্যে আরও খারাপ ও চ্যালেঞ্জিং দিন আসতে চলেছে। বিশেষত আরএসএফ এর তরফ থেকে আগামী দশ বছরের জন্য সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে সারা দুনিয়ার সংবাদ মাধ্যমের প্রতি।

ভারত এই মূহুর্তে এই তালিকায় রয়েছে ১৪২ তম স্থানে! স্পষ্টতই বৃহত্তম গনতন্ত্রের নিরিখে এই র‍্যাঙ্ক কিন্তু যথেষ্ঠই আপত্তিজনক। তবে পেছনে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারনও রয়েছে।

স্বাধীনতার পরপরই ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিমেরু বিশ্বে ভারত সরকারিভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও‚ আদতে তার ঘনিষ্টতা ছিলো সোভিয়েত শিবিরের প্রতি। সেই সোভিয়েত শিবির‚ ঠান্ডা যুদ্ধে যাদের দাবি ছিলো মানুষের বাক স্বাধীনতা‚ স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার‚ সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া – এসবের কোনো প্রয়োজনই নেই। মানুষ দিনের শেষে পেটভরে খেতে পেলেই তা যথেষ্ঠ! যদিও সেটুকুও তারা পাচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্যে কোনো স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বা সংস্থাকে থাকতে দেওয়া হয়নি সেসব দেশে। রাষ্ট্রের ভেতরের কোনো খবরই বাইরে আসতে দিতোনা “জনদরদী” শাসকশ্রেণী! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে‚ এই ঠান্ডা যুদ্ধে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতা ভিত্তিক মুক্ত পৃথিবীই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে। হেরে যায় সোভিয়েত শিবির। খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নকেই ভেঙ্গে ১৫ টুকরো করে ছাড়ে তাদের “বাক স্বাধীনতার প্রয়োজন না থাকা” ক্রুদ্ধ সোভিয়েতবাসী।

যাইহোক‚ এই মেরুকৃত পৃথিবীতে অজান্তেই হোক বা জেনেশুনে‚ সোভিয়েত ঘনিষ্ঠ সমস্ত রাষ্ট্রই সংবাদমাধ্যমের উপর কমবেশি সোভিয়েত মডেল আরোপ করে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে ক্ষুন্ন হয় সেসব দেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। স্বাভাবিকভাবেই ভারতও তার ব্যতিক্রম ছিলোনা। আর সংবাদমাধ্যমের উপর এই অযাচিত নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্ত রূপ নেয় নেহেরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে এসে। জরুরি অবস্থার নামে প্রত্যেকটি সংবাদ মাধ্যমকেই তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি বা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। যদিও মানুষ এর যোগ্য প্রত্যুত্তরও দিয়েছিলো। ১৯৭৭ এর ভোটে নিদারুনভাবে হারিয়ে শাসকের ভূমিকা থেকে ইন্দিরাকে সরিয়ে দেয় ভারতের জনগণ। তবে সংবাদমাধ্যমে উপর জারি হওয়া তৎকালীন শাসক দলটির নিয়ন্ত্রণ একইভাবে থেকে যায়‚ যা কমবেশি চলে আসছে এখনো পর্যন্ত। সারাদিন রুটিরুজির খোঁজে ব্যস্ত থাকা ভারতের মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি কায়েমী স্বার্থের এই নোংরা থাবা গুড়িয়ে দেওয়া।

বর্তমান যুগে এসেও আমর যার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। সেই নেহেরুর আমল থেকেই সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের সাথে তৎকালীন শাসকদলের সখ্যতা গড়ে ওঠে। নেহেরুর নিজের দলের তেমন কোনো চিন্তন শিবির না থাকায় ভারতের সংবাদমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্র তুলে দেওয়া হয় বামপন্থীদের হাতে। নিয়মিতভাবে বিভিন্ন খেতাব‚ পুরষ্কার ও বিদেশভ্রমন দিয়ে তাদের তুষ্ট রাখা হয়। বদলে তারা সংবাদমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমাগত ন্যারেটিভ নামিয়ে যেতে থাকে শাসক দলের প্রতি। যে অশুভ জোট এখনও পর্যন্ত টিকে আছে। আর শুধু যে টিকেই আছে তাই না‚ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীকে সাধারণ শত্রু বানিয়ে সেই অশুভ শিবিরে এখন যোগ দিয়েছে অন্যান্য জাতীয়তাবাদ বিরোধী শিবিরও।

যার প্রতিফলন আমরা দেখি যে বর্তমান ভারতের বেশিরভাগ মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমই কোনো না কোনো ভাবে এই অশুভ জোটের নিয়ন্ত্রণে থেকে হলুদ সাংবাদিকতা করতে বাধ্য হয়। বেশিরভাগ মিডিয়া হাউজই আজ এই বিরোধী শিবিরের আর্থিক আনুকূল্যে চলে। ফলে প্রভুর নির্দেশ মতো বিকৃত খবর পরিবেশনে তারা বাধ্য হয়। নষ্ট হয় সংবাদবমাধ্যমের সম্মান‚ স্বাধীনতা‚ বিশ্বাসযোগ্যতা – সবই।

আর এই মাথা বিকিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার সর্বশেষ নিদর্শন বোধহয় পালঘর হত্যাকান্ড। দুজন দশনামী সন্ন্যাসী সহ তিনজন নিরীহ ব্যক্তিকে রহস্যজনকভাবে গনপ্রহারে হত্যা করার পর ভারতের প্রায় প্রতিটিই মূল স্রোতের সংবাদমাধ্যম এই ঘটনা চেপে যায় কোনো এক অদৃশ্য প্রভুর অঙ্গুলিহেলনে। পরে ডিজিটাল মিডিয়ায় সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ক্লিপিংস ফাঁস হলে তবেই সাধারণ জানতে পেরেছিলো এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা। আর তারপরও মূল স্রোতের সংবাদমাধ্যমে যেটুকু লেখা হয় তা ছিলো বিকৃত খবরে পরিপূর্ণ। যেমন‚ বাংলা প্রথম সারির একটি সংবাদপত্র লেখে যে পুলিশ সেই সন্ন্যাসীদের বাঁচানোর জন্যে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। যেখানে কিনা ভিডিওতে আমরা স্পষ্ট দেখেছি রক্ষাকর্তা ভেবে সন্ন্যাসীটি যে পুলিশকে আকড়ে ধরেছিলো‚ সেই অবহেলা ভরে তাকে ঠেলে দেয় হিংস্র ঘাতকদের মুখে। হত্যাকাণ্ডে সাহায্য করার স্ট্রিট অর্ডার না থাকলে ঠান্ডা মাথায় এমন আচরণ কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব কি? আর এই পুলিশ কর্মীকেই মিথ্যে হিরো সাজানোর চেষ্টা করেছে আমাদের সংবাদমাধ্যম। আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকেনা প্রভাবশালী মাধ্যমগুলোর খপ্পরে পড়ে ভারতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা আজ কোন অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

কিংবা কাশ্মীরে জঙ্গিদের পক্ষে সহানুভূতি উৎপাদক বিকৃত খবর পরিবেশন‚ ক্যাব-এনার্সি নিয়ে মিথ্যে ভীতি উৎপাদন করে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে রাষ্ট্র ও সংখ্যাগুরু জনগণের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা‚ পরিযায়ী শ্রমিকদের দিয়ে বিদেশী ডোনেশন প্রাপ্ত ভুঁইফোর এনজিওর মিথ্যে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রিপোর্টকে যাচাই না করেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া‚ বাংলাদেশ-পাকিস্তানে সেদেশের সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের খবর প্রকাশ না করা বা আংশিকভাবে প্রকাশ করা‚ নির্দিষ্ট একটি ধর্মসম্প্রদায়ের কারও দ্বারা কোনো খুন ধর্ষন হলেই সংবাদপত্রে অভিযুক্তের নাম পরিচয় প্রকাশ না করা‚ আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক ব্যবস্থায় একটি অতি সাধারণ কাজ অনাদায়ী ঋন মুছে দেওয়া (write off) কে ঋণ মকুব ( loan waiver ) বলে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেওয়া – এমন অজস্র অজস্র উদাহরণ আমরা প্রতিদিনই দেখছি‚ যাতে প্রমানিত হয় পূর্বোক্ত অশুভ জোট‚ বিদেশী শক্তি‚ নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়‚ সংকীর্ণ ভূরাজনীতি – এসবের থাবার নীচে পড়ে কিভাবে সংবাদমাধ্যম তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে! আমাদের মতো সাধারণ ভারতবাসীর জন্যে এ এক বিপদ সংকেত বৈকি?

তবে হ্যাঁ‚ বাকি দুনিয়ার অবস্থাও কিন্তু মোটেও আলাদা কিছুনা। প্রায় সব দেশেই সংবাদমাধ্যম হয় রাষ্ট্র নয় কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীর হাতে বন্দী হয়ে আছে‚ নিপীড়িত হচ্ছে। যার নমুনা আমরা দেখতে পাই ২০০ টি দেশের মধ্যে সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতার তালিকায় ফিলিপাইন (দুই ধাপ নেমে ১৩৬তম)‚ভিয়েতনামে (১৭৫তম‚ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র (৩ ধাপ এগিয়ে ৪৫তম)‚ সৌদি আরব (দুই ধাপ ওপরে উঠে ১৭০তম)‚ মিশর (তিন ধাপ নেমে ১৬৬তম)‚ রাশিয়া (১৪৯তম)‚আফগানিস্তানে (এক ধাপ নেমে ১২২তম)‚ মায়ানমারে (এক ধাপ নেমে ১৩৯তম) ও চীন (১৭৭তম) এর অবস্থান দেখে। প্রসংগত উল্লেখ্য যে‚ চীন সরকার করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের খবরই সেন্সর করে রেখেছে। আবার ১৯৯২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মোট ১৩৬ জন সাংবাদিককে সিরিয়াতে খুন হয়ে যেতে হয়েছে শাসক বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মনমতো খবর না প্রকাশ করার “অপরাধে”।

আর এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেই স্বাধীন ভাবে লড়ে যাচ্ছে অনলাইন পোর্টাল‚ স্থানীয় ক্ষুদ্র সংবাদপত্র প্রভৃতি স্টার্টআপ গুলো। তাদের কাছে হয়তো প্রয়োজনীয় অর্থ নেই‚ যথেষ্ট লোকবল নেই‚ মাথার উপর কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অভয়হাত নেই‚ কিন্তু এর মধ্যেও তারা লড়ে যাচ্ছে সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের কাজে। হয়তো সবক্ষেত্রে তারা সফল হয়না‚ ১০০% সফলতা পৃথিবীর কারও কাছেই আশা করা সম্ভব নয়‚ তবুও তাদের এই সীমিত প্রয়াসই আজকের এই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হীনতার যুগে আশার একমাত্র আলোকবর্তিকা। মুঘলযুগে বিদেশ থেকে আসা মুঘল শাসিত সম্পূর্ণ ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মারাঠা‚জাঠ‚ চিতোর‚ সৎনামী‚ শিখ‚ প্রতাপ আদিত্যের যশোহর – প্রভৃতি ক্ষুদ্র ও সীমিত শক্তির জাতীয়তাবাদী
পকেটগুলোর মতোই এই অনলাইন পোর্টাল গুলোই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার একমাত্র ধ্বজাধারী ! এই world press freedom এর দিনটিতে তাদের সহ পৃথিবীর যাবতীয় স্বাধীনচেতা লড়াকু সংবাদমাধ্যম-কর্মীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হলো আমাদের তরফ থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *