Breaking News

বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের প্রায় ৭০০ বছর পুরাতন ঐতিহ্যপূর্ন একটি উৎসব হলো ঝাঁপান উৎসব।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মন্দির-শহর বিষ্ণুপুরে প্রতি বছর শ্রাবণ সংক্রান্তিতে হয় ঝাঁপান উৎসব, যা আদতে বিষধর সাপ নিয়ে খেলা দেখানো৷ ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে এই প্রথা৷

একটা গল্প প্রচলিত আছে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের আদিপুরুষ রঘু সম্পর্কে৷ বালকবয়সে পালক-পিতার গরু চরাতেন রঘু৷ একদিন ক্লান্ত হয়ে মাঠের ধারে, আলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন৷ সেইসব তাঁর পালক-পিতা দেখেন, অতিকায় এক মহাসর্প তার বিশাল ফনা রঘুর মাথার উপর তুলে পাহারা দিচ্ছে৷ সেই থেকেই নাকি বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবংশের রক্ষক হল সাপ৷

আর ঐতিহাসিকরা বলেন, অধুনা ঝাড়খণ্ডের রাঁচির কাছে রামগড়ে যে নাগ বংশীয় ক্ষত্রিয়দের বাস ছিল বলে জানা যায়, সম্ভবত তাদেরই কেউ পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে এসে রাজত্ব শুরু করেছিলেন৷ নাগদেবী মনসার আরাধনা বিষ্ণুপুরে সেই তখন থেকেই, যা একসময় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা উপভোগ করে এসেছে৷ ৫০০ বছর পরেও বিষ্ণুপুরে মনসাপুজো এবং সেই উপলক্ষ্যে সাপখেলা চালু আছে, যা ঝাঁপান নামে পরিচিত৷

সাপের খেলা দেখাবার নাম ঝাঁপান কেন? পুরাকালে সাপুড়ে এবং গুণিনরা তাদের ভক্তদের কাঁধে বওয়া চতুর্দোলায় চড়ে সাপের খেলা দেখাতে আসতেন৷ এই ধরনের মনুষ্যবাহিত যানকে বলা হতো যাপ্যযান, যার থেকে ঝাঁপান শব্দটি এসেছে৷

এই ঝাঁপান উৎসব যতটা না ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, তার থেকে বেশি একটি লোকায়ত প্রথা৷ জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ থেকে একেবারে আশ্বিন-কার্তিক মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ যতদিন শস্যক্ষেতে চাষের কাজ চলে, ততদিন ধরে মনসাপুজো চলে৷ একটাই কারণে, যাতে কৃষিকাজ করতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ না যায়৷

বিষ্ণুপুরে যেমন মনসাপুজো এবং ঝাঁপানে সামিল হয় ক্যাওট বা অন্ত্যজ শ্রেণির কৈবর্ত্য সম্প্রদায়৷ দু’ধরনের ক্যাওট হয়৷ হালি ক্যাওট, যাঁরা হাল চাষ করেন, আর জালি ক্যাওট অর্থাৎ যাঁরা জাল দিয়ে মাছ ধরেন৷ বর্ষাকালে এদেরই সাপের কামড় খাওয়ার ভয় সব থেকে বেশি৷ কিছুটা যেন সাহস জোগাতেই সাপুড়েরা শ্রাবণসংক্রান্তিতে একটা উৎসবের পরিবেশে সাপ নিয়ে খেলা দেখান৷

৫০০ বছর পরেও বিষ্ণুপুরে মনসাপুজো এবং সেই উপলক্ষ্যে সাপখেলা চালু আছে, যা ঝাঁপান নামে পরিচিত৷

আগে নিয়ম ছিল, ঝাঁপানের শুরুতে সাপুড়েদের কোনও একটা দল রাজবাড়ি গিয়ে রানিমাকে সর্পদর্শন করাবে৷ এখানেও লুকিয়ে আছে উপ-মহাদেশে প্রচলিত ফার্টিলিটি কাল্ট বা প্রজনন সংস্কৃতি-জাত একটা বিশ্বাস যে সাপ হল ফলন, বংশ বিস্তারের প্রতীক৷ সে কারণে বিষ্ণুপুরের রাজা নন, বরং রাজমহিষী ঝাঁপানে প্রথম সাপ দেখার সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন৷

এখন আর রাজার শাসন নেই, রাজপরিবারও নেই৷ কিন্তু রাজদরবার ছিল যে জায়গায়, সেখানে গিয়ে প্রথম খেলা দেখাবার রেওয়াজটা এখনও চালু আছে৷ বিষ্ণুপুরেই দুটি দল আছে, যারা নিয়মিতভাবে এই ঝাঁপানে অংশ নেয়৷ কিন্তু ওরা ছাড়াও বাঁকুড়ারই হেতিয়া এবং পুরুলিয়ার অযোধ্যা থেকে সাপুড়েদের দল আসত একটা সময়৷ কিন্তু এখন যেহেতু সব কিছুরই খরচ বেড়েছে, সাপুড়েদের আর্থিক দাবিও বেড়েছে৷

অবশ্য সাপুড়ে বৃত্তিও এখন আর কেউ নিতে চায় না৷ সারা বছর অন্যান্য চাষ-বাসের কাজ করার পর ঝাঁপানের সময় খেলা দেখাতে আগ্রহও খুব একটা নেই৷ কারণ সেভাবে কোনও রোজগার হয় না ঝাঁপান থেকে৷

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোকসংস্কৃতি দপ্তর থেকে নামমাত্র একটা অর্থসাহায্য চালু ছিল, কিন্তু গত বছর থেকে সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ আপাতত একটা লটারির আয়োজন করে কিছু টাকা তোলেন উদ্যোক্তারা, কিন্তু সেটাও যথাযথ আইনি অনুমোদন নিয়ে নয়৷ ফলে এক ধরনের সংকটেই পড়েছে বিষ্ণুপুরের অর্ধ সহস্র বছরের পুরনো এক লৌকিক প্রথা তথা উৎসব৷ এমন হতেই পারে যে হয়ত পরের বছর থেকেই বন্ধ হয়ে গেল ঝাঁপান এবং একদিন হারিয়ে গেল ইতিহাসের পাতা থেকেও৷ প্রবীণ মানুষরা এখনই আফশোস করেন, আগেকার সাপুড়েদের দক্ষতা আর খেলা দেখাবার চমৎকারিত্ব আর দেখা যায় না৷ এবং যেহেতু সাপুড়ে-বৃত্তি বংশ পরম্পরা ধরে চলে আসে, কোথাও তা শেখার ব্যবস্থা নেই, খুব শিগগিরি এই পেশাও হয়ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সমাজ থেকে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *