Breaking News

শ্রীমদ্ভগবত গীতার সুত্রে শ্রী কৃষ্ণ এবং অর্জুনের এক কথপোকথন

দ্রোণের মৃত্যুর পর ষোড়শ দিনে কর্ণ কৌরব পক্ষের সেনাপতি হন। এদিন নকুল কর্ণের নিকট দ্বৈরথ যুদ্ধে পরাজিত হন। এদিন পাণ্ডব সেনাপতিরা কর্ণকে ঘিরে ফেলেছিলেন, কিন্তু তাঁরা কর্ণকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। সূর্যাস্তের সময় কর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার করেন।

সপ্তদশ দিনে যুধিষ্ঠির এবং ভীম কর্ণকে আক্রমণ করেন, কিন্তু দ্বৈরথ যুদ্ধে কর্ণের নিকট পরাজিত হন। নকুল বৃষসেনের নিকট পরাজিত হন, কিন্তু অর্জুনের নিকট বৃষসেন পরাজিত ও নিহত হন। একই সময়ে ভীম দু:শাসনকে পরাজিত করেন এবং নির্মমভাবে হত্যা করেন।

কর্ণ ক্ষিপ্ত হয়ে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ভীষণ যুদ্ধ লাগে। দুইজন সমান যোদ্ধা হওয়ার কারণে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছিলেন না। সবাই নিজ নিজ যুদ্ধ ভুলে অর্জুন এবং কর্ণের যুদ্ধ দেখতে লাগলেন। কর্ণের রথের সারথী ছিলেন শল্য, যিনি ছিলেন সম্পর্কে পাণ্ডবদের মামা। তিনি কর্ণকে নানা কথায় কাবু করতে লাগলেন।

রথ থেকে নেমে এলেন কর্ণ, টেনে তোলার চেষ্টা করলেন চাকা। কিন্ত একি! তার শক্তিতে যেন পৃথিবী নিচে নেমে যেতে চায় কিন্ত চাকা আর মুক্ত হয় না। ওদিকে তার প্রতিপক্ষ অর্জুন দ্বিধান্বিত অবস্থায় অস্ত্র নিয়ে অপেক্ষা করছেন, নিরস্ত্র যোদ্ধাকে আঘাত করা যে শাস্ত্রসম্মত নয়!

কর্ণ কিছুতেই রথকে তুলতে পারছেন না। ব্রহ্ম অস্ত্রের মন্ত্র ভুলে গেছেন। অভিশাপের কথা গুলো মাথায় কিলবিল করছে বিষাক্ত সর্প এর ন্যায়।

কর্ণ আশা করেছিলেন অর্জুন নিরস্ত্র যোদ্ধাকে আঘাত করবেন না, যেমনটা তিনি করেছিলেন। হয়তো তাইই হত। কিন্তু কিন্তু কিন্তু…অভিমন্যুকে সেই হত্যা করেছিল। শেষ তরবারির কোপ মেরেছিল।

চিৎকার করে উঠল কর্ণ , ” অর্জুন , আমি তো অভিমন্যুকে মুক্তি দিয়েছিলাম।ওর কষ্ট হচ্ছিল।আমি দেখতে পারছিলাম না……..” অর্জুনের অস্ত্রের আঘাতে মাথা কেটে পড়ল মাটিতে…

যুদ্ধ সেদিনের মত সাঙ্গ। শিবিরে শিবিরে হা হা কার, যন্ত্রণার কাতর আর্তনাদ। কৃষ্ণ শিবিরে ধ্যানে বসেছেন। এ সময় অর্জুন এলেন।

ধ্যান ভঙ্গ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন বাসুদেব , ” এস , এস মিত্র , স্বাগত।”

“গোবিন্দ , একটি প্রশ্ন ছিল?”

পার্থের গম্ভীর , অভিমান ভরা মুখমন্ডল দেখলেন কৃষ্ণ । তিনি জানেন পার্থ কি বলবেন ….হাসলেন ….বললেন , ” মিত্র , তুমি মহারথী , কিন্তু কর্ণ মহানরথী…”

চিৎকার করে উঠলেন অর্জুন , ” কেন , কেন , কেন? আমি তাকে হারিয়েছি , হত্যা করেছি। সে তার গান্ডিব চলানা নিয়ে বড় অহংকারী ছিল। কিন্তু আজ প্রমাণিত।সে আমার নখের ধুলার যোগ্য ছিল না।”

ভ্রূ কুঞ্চিত হরি , কথা গুলো তার কানে লাগল , ” কি ? কি বললে পার্থ ? তোমার নখের যোগ্য সে নয়? কোথায় লুক্কায়িত ছিল এমন অহংকার ?”

” অহংকার !অহংকার ? অহংকার কেন করব গোবিন্দ? আমি সত্য বচন বলছি! সে আজ আমার সঙ্গে যুদ্ধে পেরে ওঠেনি। সে হেরে গেছে ।সে মৃত ।তবু তুমি কেন বারবার তাকে আমার থেকেও বেশি মহান করার চেষ্টা করছো?”

গম্ভীর হয়ে উঠলেন শ্রীকৃষ্ণ, ” অর্জুন তোমার বান পিতামহকে নিষ্ক্রিয় করেছিল তাই না ?”

“হ্যাঁ বাসুদেব , কিন্তু….”

“তাহলে কি তুমি এটা প্রমাণ করতে চাইছ যে পিতামহ তোমার থেকে কম শক্তিশালী?”

“না না বাসুদেব, তুমি কি বলছ পিতামহ ভীষ্ম মহান… তিনি গঙ্গা পুত্র …তিনি দেবব্রত…. তিনি তার ভীষণ প্রতিজ্ঞা কারীর জন্য ভীষ্ম হয়েছেন। তিনি মহান যোদ্ধা। তুমি কার সঙ্গে কার তুলনা করছ?”

“আমি সঠিক তুলনায় করেছি… পার্থ অর্থাৎ তুমি স্বীকার করছ যে ভীষ্ম তোমার কাছে হেরে গেলেও তিনি যোদ্ধা ছিলেন… তাহলে তুমি আজ এটাও স্বীকার কর, যে কর্ণ তোমার কাছে হেরে গেলেও সে কিন্তু মহারথী ছিলেন।”

” কিন্তু বাসুদেব …”

“অর্জুন তোমার মনে আজ এত, কিন্তু, এত দ্বিধা, কেন উৎপন্ন ঘটছে? তুমি কিন্তু তাকে হত্যা করনি …”

“কি বলছ বাসুদেব ? আমি আমি… ওর হত্যা করিনি? আমি তার ওপর বান চালিয়েছি… আমার বান তার মাথা কেটে ভূমিতে পতিত করেছে…”

“পার্থ তুমি …তোমার বান… সব মাধ্যম.. কর্ণকে হত্যা করেছে তা অভিশাপ। সে অভিশপ্ত ছিল। ভগবান পরশুরাম দ্বারা, ব্রাহ্মণ দ্বারা, সে অভিশপ্ত হয়েছিল, যে যুদ্ধের সময় অন্তিম মুহূর্তে সে তার ব্রহ্ম মন্ত্র ভুলে যাবে। তার রথের চাকা মাটি গ্রাস করবে । তুমি তো জানো পার্থ সব…”

পার্থের বিবেক দংশন হলো, সে কৃষ্ণের পায়ের কাছে বসে পড়ল, ” হে বাসুদেব , হে নারায়ন আচ্ছা বেশ কথা অভিশাপ তাকে মেরেছে.. কিন্তু আমার থেকে সে বড় যোদ্ধা কেমন করে হলো?

” পার্থ এই যে তুমি আজ বেঁচে আছো , এই যে তুমি আজ এসে আমার কাছে চিৎকার করছো.. এই জীবন এটা কর্ণ তোমায় দান করেছে …কর্ণ আজ স্বেচ্ছায় মরেছে… কর্ণ চাইলেই আজ কিন্তু তোমাকে তাড়া না করে অন্য আরও যোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারত পার্থ…”

” বাসুদেব আমি যখন কর্ণ কে প্রহার করতাম তখন কর্ণের রথ দশ পা পিছনে চলে যেত। আর কর্ণ যখন আমাকে প্রহার করতো তখন আমার রথ মাত্র দু পা পিছনে যেত। বাসুদেব তাহলে কি আমি ওর থেকে বড় যোদ্ধা নয়?”

“না নয়। কারণ তোমার রথ কে চালাত বলতো?”

“কেন? তুমি গোবিন্দ, নারায়ন…”

“পার্থ ! সৃষ্টি স্থিতি স্বর্গ নিয়ে, ত্রি লোকের ভার নিয়ে আমি তোমার রথের সারথি হয়েছিলাম। সেই প্রবল ভার কে কর্ণের প্রহার দুপা পিছনে সরিয়ে দিত ।আর তোমার প্রহার কর্ণকে মাত্র দশ পা পিছনে সরাত। তাহলে কে মহান যোদ্ধা হলো অর্জুন?”

“কর্ণ কে এমনি এমনি লোকে দানবীর বলে না ….পার্থ… সূর্য পুত্র কর্ণ। সে সুতপুত্র ছিল না । তারা আরও বড় পরিচয় ছিল। সে এই পরিচয় জেনেও নিজেকে গুপ্ত করে রাখতে পেরেছিল যুদ্ধে শেষ সময় পর্যন্ত। পার্থ, আমি তার কাছে গিয়েছিলাম তাকে অধর্মের মার্গ ছেড়ে ধর্মের মার্গে ফিরে আসার জন্য বলতে। যান পার্থ সে আমাকে কি বলেছিল? সে আমাকে বলেছিল যে ,

” হে, বাসুদেব, আমি রাধেয় । আমার দুঃখের সময় সঙ্গী ছিল আমার বন্ধু দূর্যোধন ।আমার অপমান, যন্ত্রনা একমাত্র সেই আমার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। আভিজাত্য, অর্থ যে মানুষের যোগ্যতা নির্ণয় করে তা সে উপলব্ধি করেছিল বলেই , আমাকে সে অঙ্গরাজ বানিয়েছিল। আমার সুখে দুখে সাথী ছিল সেই দূর্যোধন, সে আমাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে । তাই বিপদ কালে আমার বন্ধু সঙ্গ দেওয়াটাকেই আমি ধর্ম বলে মনে করি । আর তার সঙ্গ পরিত্যাগ আমি অধর্ম বলে মনে করি…আমি কুরু পক্ষ ত্যাগ করব না। প্রয়োজনে আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব।”

“পার্থ , সে সেটাই করেছেন। সে অধর্মের সঙ্গে মিত্রতাও করেছেন , প্রাণ দিয়ে ধর্ম পালন করেছেন। “

“একি পার্থ তুমি কাঁদছ? বিবেক দংশন প্রবল হচ্ছে । হোক। অহংকারের মৃত্যু ভালো। কর্ণের মত মহান আত্মা এই পৃথিবীতে খুব কম জন্মায়….আরো একটা কথা বলি…”

“কি কেশব?”

“কর্ণ তোমাদের মঙ্গলের জন্য নিজের কবজ , কুন্ডল কেটে তোমাদেরই খুব প্রিয় কাউকে দিয়েছেন। কাকে প্রশ্ন করো না…তার অন্তেষ্টির সময় তুমি জেনে যাবে …আর যখন জানবে তখন এই তুমি ভূমিষ্ট হয়ে তাকে প্রতিদিন দেব জ্ঞানে পূজা করবে…….”

তথ্যসূত্রঃ

১. পাঞ্চ্যজন্য – গজেন্দ্রকুমার মিত্র

২. মহাভারত – আর কে নারায়ণ

৩.মহাভারত – রাজশেখর বসু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *