Breaking News

ঋষি কাশ্যপ এবং ভদ্র কাপিলানির গল্প

বহু বহুকাল আগে মগধ রাজ্যের অন্তর্গত মহাতীর্থ গ্রামে মহাসালকুলে কপিলের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন পিপ্ফলী মানব। তার স্ত্রী ছিলেন ভদ্রাকাপিলানি । তাঁর স্ত্রী ভদ্রা কাপিলানি মদ্র রাজ্যে সাগল নগরে মহাশালকুলে কোসিয় গোত্র ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব রূপবতী ।জম্বুদ্বীপ এর প্রতিটি রাজ্য তার রূপের প্রশংসা মত করত তার রূপে তার দেহ প্রভায় গৃহ আলোকিত হত এবং প্রদীপের আবশ্যক হত না।

কথিত আছে এই পিপ্ফলী মানব ছিলেন ব্রহ্মলোক চুত। যারা ব্রহ্মলোক থেকে মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করেন তাদের সংসারের প্রতি কোন আশক্তি থাকে না । পিপ্ফলীরও ছিল না। বিধাতার কোন খেলায় তবু পিপ্ফলী ও ভদ্রা কাপিলানি র বিবাহ সুসম্পন্ন হল।

সংসারের অমোঘ নিয়মে এদের পিতামাতা হয়তো এদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলেন । কিন্তু এরা প্রত্যেক ব্রহ্মচর্য পালন করলেন সাংসারিক জীবনে । পিতা মাতার মৃত্যুর পর বিপুল ঐশ্বর্য্য এর অধীশ্বর হলেন তাঁরা। গৃহে থাকলে অতুল ঐশ্বর্যের মাঝে পাপ কর্মে লিপ্ত হলেও হতে পারে এই উপলব্ধি করে উভয়ে প্রব্রজিত হয়েছিলেন ।

এক অন্ধকার রাত্রে এই বিপুল ঐশ্বর্য পরিত্যাগ করে যখন পিপ্ফলী ব্রহ্মচারী ব হয়ে পথ চলতে শুরু করলেন ।এই সময় তিনি হঠাৎ দেখলেন তা তাঁর স্ত্রী ভদ্রা জম্বুদ্বীপ এর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী তাকে অনুসরণ করে আসছেন। তিনিও সংসার ত্যাগী হয়েছেন। পিপ্ফলী ভাবলেন, জম্বুদ্বীপের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী তিনি যে আমাকে অনুসরণ করে আসছেন এটি লোকে দেখলে কী মনে করবে? মনে করিবে যে “আমরা প্রব্রজ্যা ধর্ম্ম অবলম্বন করেও আসক্তি ত্যাগ করতে পারি নাই।” এই কার্য অন্যায়। অগত্যা পথে সহসা দন্ডায়মান হয়ে পিপ্ফলী ব্রহ্মচারিণীকে বলিলেন; “ভদ্রে, তোমার ন্যায় স্ত্রীরত্ন আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করতে দেখলে লোকে নানা কুকথা বলে নিরয়গামী হতে পারে, এতে আমাদের উভয়েরই অন্যায় হবে, এই দুই পথের মধ্যে আপনি একটা গ্রহণ করুন, আমি অন্য পথে যাব”।

তখন ব্রহ্মচারিণী বলিলেন; “হাঁ আর্য্য, আমরা প্রব্রজিত হয়েও বিচ্ছিন্ন হচ্ছি না বলে লোকে নানা কুধারণা পোষণ করতে পারে”। এই বলে তিনি স্বামীকে তিন বার প্রদক্ষিণ করে, করজোড়ে প্রণাম করলেন। তারপর বললেন…”শত সহস্র কল্প কালের মিত্র সদ্ভাব অদ্য বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, আপনি পুরুষ, সুতরাং দক্ষিণপথই আপনার অবলম্বনীয়। আমি মাতৃগ্রাম বামাজাতি, আমার বাম পথেই যাওয়া উচিত” এই বলে ভদ্র্ কাপিলানি বাম পথ অবলম্বন করলেন।

তারা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক ।একে অপরের যোগ্য জীবন সঙ্গী। ঈশ্বর তাদের একে অপরের জন্য নির্ণয় করেছিলেন। তাদের বিয়োগে সসাগরা মহাপৃথিবী কম্পিত হল, আকাশে অশনিপাতের ন্যায় ভয়ানক শব্দ হল, চক্রবাল পর্ব্বত উন্নমিত হল।

তখন সম্যকসম্বুদ্ধ বেলুবনের গন্ধ কুটীরে বসেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন পিপ্ফলী মানব ও ভদ্রা কাপিলানি অপরিমিত ভোগ সম্পত্তি ত্যাগ করে আমারই উদ্দেশ্যে প্রব্রজিত হয়েছে। তাহাদের বিয়োগ কালে উভয়ের গুণ বলে এই ব্যাপার সংঘটিত হচ্ছে।

তখনই ভগবান পাত্র চীবর নিয়ে গন্ধ কুটীর হতে বাহির হলেন এবং কাকেও কিছু না বলে একাকী তিন গব্যুতি (ক্রোশ) পথ গিয়া রাজগৃহ ও নালন্দার মধ্যস্থিত বহুপুত্র বটবৃক্ষ মূলে পদ্মাসনে উপবেশন করলেন।

বুদ্ধদেব নিজ রূপেই ধ্যানমগ্ন হলেন
তখন তিনি সিদ্ধি লাভ করেছেন। তার বুদ্ধজ্যোতি চন্দ্র সূর্যের ন্যায় বিচ্ছুরিত হচ্ছে চারিদিকে। তার দেহ থেকে বনান্তর উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। সেই গভীর রাত্রে ও বন থেকে বনান্তরে যেন শরতের আগমন ঘটল। দিকে দিকে পদ্ম প্রস্ফুটিত হল। তখনও তিনি কোনো শ্রাবক গ্রহণ করেন নি।

পিপ্ফলী সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন বুদ্ধের খোঁজে। তিনি হঠাৎ ই দেখলেন ভগবান বুদ্ধ বৃক্ষের নিচে ধ্যানস্থ। পিপ্ফলী চিন্তা করলেন”ইনিই আমার গুরু হবেন, এনারই উদ্দেশ্যে বোধহয় প্রব্রজিত হয়েছি”

এসব চিন্তা করে তিনি অবনত মস্তকে বুদ্ধের নিকট গিয়ে বললেন;“ ভগবান্, আপনিই আমার শাস্তা ( গুরু), আমি আপনারই শ্রাবক”।

বুদ্ধ তখন ধ্যান ভঙ্গ করে বললেন ” হে কশ্যপ তোমার গুণের প্রভাবে সসাগরা মহাপৃথিবী কম্পিত , পৃথিবী তোমার গুণ রাশি ধারণে অসমর্থা….কশ্যপ, উপবেশন কর, তোমাকে আমার কিছু জ্ঞান দান করি।” তারপর বুদ্ধ ত্রিশরন গ্রহণ দ্বারা পিপ্ফলীকে উপসম্পদা প্রদান করলেন।

তারপর সেখান থেকে নদীর দিকে চলতে শুরু করলেন । শাস্তার শরীর বিচিত্র দ্বাত্রিংশৎ মহাপুরুষ লক্ষণে, পিপ্ফলী শরীর সপ্ত মহাপুরুষ লক্ষণে প্রতিমণ্ডিত ছিল। পিপ্ফলীর নাম তখন মহাকশ্যপ। তাঁকে কিছু পূর্বে বুদ্ধ সেই নামেই ডেকেছেন।

বৃহৎ নৌকায় পশ্চাৎ বদ্ধ ক্ষুদ্র নৌকার ন্যায় মহাকশ্যপ শাস্তার পিছু পিছু যেতে লাগলেন। শাস্তা কিয়দ্দুর গিয়ে পথ ত্যাগ করে এক বৃক্ষ-মূলে বসবার ইঙ্গিত করলেন। শাস্তা বসতে ইচ্ছুক জেনে মহাকশ্যপ স্বীয় পট সঙ্ঘাটী চীবর চতুর্গুণ ( কোমরে জরানো অতিরিক্ত একটি বস্ত্র চার ভাঁজ) করে বিছিয়ে দিলেন।

তার উপর বুদ্ধ বসে বললেন , “আহা। তোমার এই বস্ত্র খন্ড খুব নরম, আরামদায়ক…” মহাকশ্যপ ভাবলেন গুরুদেবের হয়ত বস্ত্র খন্ড ভালো লেগেছে। তিনি ঐটি পড়তে ইচ্ছুক। ফলে
মহাকশ্যপ বুদ্ধদেব কে নিবেদন করলেন ” গুরুদেব আপনি বস্ত্র টি পরিধান করুন…”

তখন ভগবান বললেন;“তা হলে কশ্যপ, তুমি কি পরিধান করবে”?

মহাকশ্যপ নিবেদন করলেন; “ভন্তে, আপনার কাপড় খানা পেলে গায়ে দেব”।
বুদ্ধ মৃদু হেঁসে নিজ চিবর খানি মহাকশ্যপকে দান করলেন। হতে পারে তা জরাজীর্ন পাংশু বস্ত্র। কিন্তু সে যে সিদ্ধ বস্ত্র। তাকে ধারণ করে এমন গুন বা ক্ষমতা কলি যুগে কার আছে?

সেই গুন ধারনে অক্ষম পঞ্চভূত কম্পিত হয়ে উঠল।মহাপৃথিবী বলে উঠল, “ভন্তে, অতি দুষ্কর কার্য্য করলেন, শ্রাবকের সঙ্গে পরিহিত বস্ত্র কেউ পরিবর্ত্তন করেন নি, আমি আপনার এই গুণ মহিমা ধারণে অক্ষম”….

কিন্তু আয়ুষ্মান মহাকশ্যপ ভগবানের পরিহিত বস্ত্র পেয়ে স্ফীতমন হলেন না, তাঁকে ধারনের শক্তি চাই….তখনই তিনি ভগবানের নিকট হতে ত্রয়দশ প্রকার ধুতাঙ্গ ব্রত গ্রহণ করলেন। তিনি সাত দিন মাত্র পৃথগজন ভাবে থেকে অষ্টম দিবসে চতুর্ব্বিধ প্রতিসম্ভিদার সাথে অর্হত্ব ফল প্রাপ্ত হলেন।

অতঃপর বুদ্ধ ভিক্ষুগণকে বললেন“ভিক্ষুগণ, কশ্যপ চন্দ্রের ন্যায় লোকের বাড়ীতে সমুপস্থিত হয়, তার কায় এবং চিত্ত কুলে অনাসক্ত, নিত্য নূতন নূতন কুলে অপ্রগলভের সঙ্গে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে থাকে …..” ইত্যাদি রূপে তাঁর বহুতর প্রশংসা করে অপর ভাগে আর্য্যগণের মধ্যে সিংহনাদে ঘোষণা করলেন “ভিক্ষুগণ, আমার ধুতবাদ ভিক্ষু শ্রাবকদিগের মধ্যে এই মহাকশ্যপই অগ্রতম…” বলে তিনি মহাকশ্যপকে
অগ্রস্থান প্রদান করলেন।

তথ্যঃ জয়মঙ্গল অষ্টগাথা

মহাপরিনির্বাণ সূত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *