Breaking News

বিষ্ণুপুরের ইতিহাসের জীবন্ত দলীল

হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার মন্দির ইতিহাস ও লোকগাথা। কালের গর্ভে অনেক কিছুই বিলীন। তথাপি যেটুকু তুলে আনা যায় হৃতগৌরব। কলম ধরলেন দুর্গেশ নন্দিনী।

 

কবির ভাষায় বিষ্ণুপুর বলতে যা বোঝায়

গাইয়ে, বাজিয়ে, সুর,
তিনে বিষ্ণুপুর।

 

বসতি শেষ, লাল মাটি, ঢেউখেলানো রুক্ষ কাঁকুড়ে জমি, গেরুয়া নদীখাত, ছোটনাগপুরের চড়াই-উতরাই, শালের জঙ্গল। বহু দূরে পাহাড়ের ধূসর রেখা। টেরাকোটার অপূর্ব সম্পদে পূর্ন বিষ্ণুপুর। বিষ্ণুপুর প্রাচীন স্বাধীন রাজ্যে, মল্লভূম, নিরিবিলি…

কিন্তু শুধু কি গান-বাজনা নিয়েই বিষ্ণুপুর ? তার আসল খ্যাতি তো টেরাকোটা মন্দিরের জন্য। এ ছাড়াও আছে বালুচরী, দশাবতার তাস, শাঁখ, লণ্ঠন আর মতিচুর। তাই অনেক কিছু নিয়ে বিষ্ণুপুর। ইতিহাসে বিষ্ণুপুর দেশ-বিদেশের গাইয়ে-বাজিয়েদের এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়। আর তাঁদের হাত ধরেই বিষ্ণুপুর ঘরানার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন টেরাকোটা মন্দির শৈলীর জন্যও বিখ্যাত ছিল ও আছে বিষ্ণুপুর।মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুর।বাংলার মন্দির এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য গুলির মধ্যে রত্ন রীতি বা রত্ন মন্দিরের বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । রত্ন মন্দির এর নির্মাণ কৌশল এর অভিনবত্ব লক্ষ্য করবার মতো । অন্যান্য বিভিন্ন রীতির মত এর ঊর্ধঅংশ নিম্নাংশের স্বাভাবিক পরিণতির ফল নয় ; পরস্পরের মধ্যে দৈহিক কোন বন্ধ নেই।

ঈষৎ বক্র একটু নিচু আচ্ছাদনের নিম্নাংশ স্বয়ং সম্পূর্ন । উপরের অংশটি পৃথক ভাবে গঠিত হয়। ভাবকল্পনার এই মূলগত কৃত্রিমতাই রত্ন মন্দিরের সর্বপ্রধান দুর্বলতা। এই দুর্বলতাকে অতিক্রম করে সামঞ্জস্যপূর্ণ , সংগত দেহ গঠনের প্রয়াসই রত্ন রীতির বিবর্তনের মূল অনুপ্রেরণা । কিভাবে এই রত্ন মন্দির এর নির্মাণ শুরু হয়েছিল বা এর ভাব কল্পনা করা হয়েছিল তার সম্পূর্ণ অজ্ঞাত তথ্য। রত্ন মন্দির বিভিন্ন রূপের মধ্যে মন্দিরের উর্ধাংশে রথ সংখ্যা অনুযায়ী যে স্বাভাবিক বিভাগ রয়েছে তাকে অবলম্বন করে রত্ন মন্দিরের বিভাগ করা যেতে পারে । যথা – একরত্ন, পঞ্চরত্ন , নবরত্ন।

এই বিভাগের প্রথম পর্যায়ে পড়ে এক রত্ন মন্দির। এই মন্দির রীতি অল্পসংখ্যক ভাবে সীমাবদ্ধ হয়েছে এবং বৃহৎ একটি অঞ্চল জুড়ে এর বিস্তার ও নেই । বর্তমানে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর, পত্রসায়র , সাহারজোড়া গ্রাম , হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়া শহর, কৃষ্ণনগরের গুপ্তিপাড়া ,খানাকুলে একরত্ন মন্দিরের সাক্ষাৎ মেলে।

উপরক্ত স্থানগুলির মধ্যে বিষ্ণুপুর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রুতি অনুযায়ী কীর্তিমান মল্লরাজাদের নিরবিচ্ছিন্ন পৃষ্ঠপোষকতায় একরত্ন রীতির চর্চা বিষ্ণুপুর নগরীকে কেন্দ্র করে উন্নতি লাভ করেছিল। বিষ্ণুপুর রাজাদের উৎস রহস্যাবৃত। বিষ্ণুপুরের রাজারা এবং তাঁদের অনুগামীরা দাবি করেন যে তাঁরা উত্তর ভারতের ক্ষত্রিয় বংশোদ্ভুত। বিষ্ণুপুরের রাজারা মল্ল রাজা নামে পরিচিত। সংস্কৃত মল্ল শব্দটির অর্থ মল্লযোদ্ধা। তবে এই শব্দটির সঙ্গে এই অঞ্চলের মাল উপজাতির সম্পর্ক থাকাও সম্ভব। মল্ল রাজবংশের ৪৯তম শাসক বীর হাম্বীর ১৫৮৬ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন আকবরের সমসাময়িক। বীর হাম্বীর ছিলেন শক্তিশালী ও ধার্মিক রাজা। শ্রীনিবাস আচার্য তাঁকে বৈষ্ণব মতে দীক্ষিত করেন।

এখনও পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তাতে মনে হয় বিষ্ণুপুরের মন্দির চর্চার সূত্রপাত হয়েছিল সম্ভবত রাজা হাম্বিরের সময় কাল থেকে অর্থাৎ ষোড়শ শতকের শেষদিকে। এরপর থেকে মন্দির নির্মাণের ধারা পুরুষানুক্রমে বয়ে চলেছিল রাজা চৈতন্য সিংহের সময় । রাজা চৈতন্যসিংহের সময়কালে মল্লরাজকুল শেষ দেবালয় রাধাশ্যাম মন্দিরটি নির্মাণ হয় ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে।

সুদীর্ঘ সময়কাল ধরে বিষ্ণুপুরের যে সমস্ত মন্দির নির্মিত হয়েছিল তার মধ্যে একরত্ন মন্দিরের সংখ্যা সর্বাধিক। নির্দিষ্ট সময় ও অঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে বিষ্ণুপুরের মন্দিরের ক্রমবিকাশের ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বর্তমান বিষ্ণুপুরের প্রাচীনতম একরত্ন মন্দিরের নিদর্শন হলো কালাচাঁদের মন্দির। ৯৬২ মল্লাব্দ অর্থাৎ ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা রঘুনাথ সিং এর আনুকূল্যে এই মন্দির নির্মিত হয়।বীর হাম্বীরের পুত্র রঘুনাথ সিংহ। তাঁর রাজত্বকাল থেকেই বিষ্ণুপুর রাজ্যের স্বর্ণযুগের সূচনা ঘটে। রঘুনাথ সিংহের আমলে বিষ্ণুপুরে নয়নাভিরাম প্রাসাদ ও মন্দিরাদি নির্মিত হয়। মাকড়া পাথরের একরত্ন, মন্দিরের সামনের দিকে পঙ্খের অলঙ্করণে কৃষ্ণলীলা, পুরাণ-কথা ইত্যাদি বিধৃত। রয়েছে বাংলার দোচালা ধাঁচের তিন খিলানের প্রবেশদ্বার….

স্বল্প উচ্চ ভিত্তি অধিষ্ঠানের উপর চতুরস্র দেবালয়ের অবস্থান । আসন অবলম্বন করে দেওয়াল কিছু দূর পর্যন্ত উঠে যেখানে বক্র আকারে শেষ হয়েছে সেখানে তার উচ্চতা আসনের দৈর্ঘ্য অপেক্ষা কম বা প্রায় অর্ধেক। দেয়ালের উপরে চালারূপের স্মৃতিতে রচিত নিচু আচ্ছাদন তার ঠিক কেন্দ্রস্থল অর্থাৎ গর্ভগৃহের উপরে শিখর রীতিতে নির্মিত রত্নটির অবস্থান । চালার অনুকরণে রচিত হলেও আচ্ছাদন টি কিন্তু সর্বাঙ্গীণ বহির বর্তুল নয়। চালা আচ্ছাদনের বহির বর্তুল দুই দিক থেকে বেঁকে এসে যেখানে মিলিত হয় সেই মিলনকেন্দ্রর আকারও বহির বর্তুল। আমরা দেখতে পাই যে আচ্ছাদনের প্রতিটি অংশ উচ্চতর মধ্যস্থল থেকে ক্রমশ ঢালু হয়ে মিলন কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যায়। ফলে দুই অংশের মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে অন্তর বর্তুল। গর্ভগৃহের উপরে , আচ্ছাদনের কেন্দ্রস্থলবর্তী সুউচ্চ শিখর নিম্নাংশে তুলনায় অনেক বড় আকৃতির। অষ্টকোণাকৃতি বেদীর উপর অবস্থিত রত্নটির আসন কিন্তু তিন ভাগে বিভক্ত অর্থাৎ দেয়ালের মধ্যদেশ, উচ্চদেশ হয়ে যথাক্রমে বান্ধনা ও বরন্ড রেখার বন্ধন।

বিষ্ণুপুরের পরবর্তী শিখর রত্নগুলোর অঙ্গবিন্যাস কালাচাঁদের মন্দির এর অনুরূপ হয়েছে। তবে গন্ডির বহিরেখা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে । খাঁড়া ভাবের পরিবর্তে গম্বুজের অর্ধবৃত্তাকার গতিপথে গন্ডিকে বাঁকিয়ে দিকে তুলবার প্রচেষ্টা সমধিক লক্ষ্য করা যায়। মাকড়া পাথরে তৈরি কালাচাঁদ মন্দিরের গায়ে পৌরাণিক দেবদেবী, কৃষ্ণলীলা প্রভৃতি দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। অষ্টকোণাকৃতি এই নবরত্নবিশিষ্ট মন্দিরের চূড়ায় পদ্ম, আমলক, ঘট ও ধ্বজা। মন্দিরে ভিত্তিবেদির সমান্তরাল দু’টি সারিতে পশু পক্ষী ও পৌরাণিক ভাস্কর্য। দু’পাশের দেওয়াল ও কার্নিসের নীচে খোপের মধ্যে দু’ সারি করে মূর্তি ও ভাস্কর্য। খিলানশীর্ষে ও থামের গায়েও নানাবিধ ভাস্কর্যে সজ্জিত – বিষয় প্রধানত কৃষ্ণলীলা, দশাবতার, পদ্ম প্রভৃতি।

এই অঞ্চলে একরত্ন মন্দির সবই পাথরের, দু-একটি ইটের ছাড়া, তার মধ্যে মদনমোহন মন্দির উল্লেখযোগ্য।কালাচাঁদ মন্দির এর নিম্নাংশে প্রত্যেকে দিকেই তিনটে করে ভঙ্গি কাটা খিলান শীর্ষ প্রবেশপথ আছে । গর্ভগৃহের চতুর পার্শ্ববর্তী দালানের চারিদিক থেকে প্রবেশ করা যায় মন্দিরে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াও বিষ্ণুপুরের পাঁচটি মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন। কালাচাঁদ মন্দির তারমধ্যে একটি। কিন্তু এসবকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাতে মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে খোঁড়া খুঁড়ি করে মন্দির নষ্টের চেষ্টাও হয়েছে কয়েক বছর আগে। কিন্তু শুধু স্থাপত্যরীতির অভিনবত্বের জন্যই নয়, মন্দিরগাত্রের অনন্যসুন্দর অলঙ্করণের জন্যও এই মন্দির দেশের পোড়ামাটি স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসাবে বিখ্যাত। পোড়ামাটির প্যানেলগুলি রীতিমতো নজর কাড়ে — ভীষ্মের শরশয্যা-সহ রামায়ণ-মহাভারতের নানা কাহিনি, তৎকালীন সামাজিক জীবনযাত্রার বিভিন্ন ছবি ফুটে উঠেছে পোড়ামাটিতে।

এই বসন্তে দক্ষিণা বাতাসে , মিঠে কড়া রোদে, লাল পলাশ, শিমুল ফুলে রাঙা , লাল মাটির সরানে ঘুরে আসুন মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুরে…..  চোখের খিদে মনের খিদে এর অপূর্ব সৌন্দর্য দেখে ফুরাবে না।

“এই বাঁকুড়ার মাটিকে পেন্নাম করি দিনে দুপুরে…”

 

তথ্য ও ঋণ স্বীকারেঃ বাংলার মন্দির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *