Breaking News

বাবা বুড়োরাজের ইতিকথা, জানুন জামালপুরের বিখ্যাত বুড়োরাজের ইতিহাস

বতর্মান বধর্মান জেলার অন্তগর্ত পূবর্স্থলী থানার অধিন জামালপুর একটি ছোট্ট গ্রাম। অঞ্চলটি নবদ্বীপ শহরের পশ্চিম প্রান্তে 10 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বৃহত্তর নবদ্বীপ মহামন্ডলের অন্তর্গত। গঙ্গার গতি পরিবর্তনের পূর্বে যখন নবদ্বীপের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত হতো তখন তার পূর্বেই ছিল জামালপুর গ্রাম। এই জামালপুর গ্রাম শ্রী শ্রী বুড়োরাজ ঠাকুরের জন্য বিখ্যাত। এখানে এই বুড়ারাজ ঠাকুরের একটি অতি প্রাচীন মন্দির আছে। বুড়োরাজ এই অঞ্চলের আঞ্চলিক দেবতা হিসাবে পরিচিত। এখনো এক মন্দিরে শিব ও ধর্ম রাজের পুজো হতে দেখা যায়। রাঢ় অঞ্চলে শিব পূজার পাশাপাশি ধর্মরাজ ঠাকুরের পূজার এক প্রাচীন প্রচলন ছিল ঐতিহাসিকদের বিবরণ থেকে জানতে পারা যায়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে শিব এবং ধর্মরাজ ঠাকুরের মিলিত প্রভাবেই #বুড়ারাজ ঠাকুরের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে বুড়ো অর্থ শিব এবং রাজ অর্থ ধর্মরাজ কেই বোঝানো হয় বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

শিবকে বুড়া অভিধায় অভিহিত করতে আমরা অনেক লোক স্থানেই লক্ষ্য করে থাকি। যেমন বীরভূম জেলায় পতণ্ডা গ্রামে শিবকে “বৃদ্ধশ্বর ” বলা হয়। আবার নবদ্বীপে বুড়োশিবতলা অঞ্চলে মহাদেব “বুড়োশিব” নামে পরিচিত। আপনারা খুব অবাক হচ্ছেন ? শিব মহাদেব মহাকাল সৃষ্টি হল দেবতা তিনি বুড়ো হবেন কেন? এখানে বুড়ো বলতে বা বৃদ্ধ বলতে সেই অর্থে বয়স বৃদ্ধ বলা হয়নি, এখানে বুড়ো অর্থে “জ্ঞানবৃদ্ধ”। মঙ্গলকাব্য আমরা শিবকে এই বিশেষণে বিশেষিত হতে দেখেছি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে শিব এবং ধর্মরাজ কে এখানে কেন একত্রিত পূজা করা হয়? বহু প্রাচীনকাল থেকে রাঢ় অঞ্চল ধর্মরাজ ঠাকুরের পূজা প্রচলিত হয়ে আসছিল এর বিবরণ আমরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ,ক্ষেত্র সন্ধানী ,গবেষকদের মাধ্যমে জানতে পারি। এছাড়াও রাঢ় অঞ্চলে শিব পূজার প্রাচীন প্রচলন ছিল।

বাঁকুড়া জেলার জয়পুর থানার ময়নাপুর এর হাট তলার মন্দিরের কথা আমরা জানতে পারি সেখানে মন্দিরের উপর শিবের পূজা হতো এবং সেই মন্দিরের সুরঙ্গ পথ দিয়ে ধর্মঠাকুরের মন্দিরে যাওয়ার পথ ছিল। জামালপুর গ্রামে ধর্মরাজের পুজো লুকিয়ে করা হয়নি এখানে অতি প্রাচীনকাল থেকেই শিব ও ধর্মরাজের পুজো একত্রে করা হয়ে থাকে। তাছাড়া ধর্ম পূজার সঙ্গেসঙ্গে আরো বহু দেবতার পূজা করতে হয় যেমন লক্ষ্মী, বিশালাক্ষী ,বিষহরি, কামিন্যা। এই সমস্ত দেবী আংশিকভাবে বা পূর্ণভাবে শৈব কাল্টের সাথে যুক্ত।

ছবি সংগৃহীত

এবার আসি বুদ্ধ পূর্ণিমায় বুড়াশিব পূজার কথায়।

হঠাৎ দেখলে মনে হবে, দলবদ্ধ হয়ে বেশ কিছু মানুষ অস্ত্র হাতে যুদ্ধে চলেছে! কারও হাতে রাম দা তো কারও হাতে খাঁড়া। কেউ বা তরোয়াল উঁচিয়ে কিংবা তীর-ধনুক নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সঙ্গে রয়েছে মানতের পশু। কিন্তু যুদ্ধ নয়! সকলেরই গন্তব্য বর্ধমান জেলার জামালপুরে বুড়োরাজের মন্দির।বৈশাখী পূর্ণিমা যা বুদ্ধপুর্ণিমা বলেও পরিচিত সে দিনে বর্ধমান জেলার সবুজে ঘেরা ছোট গ্রাম জামালপুরে বুড়োরাজের মহামেলা। বৈশাখের দাবদাহ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন এখানে। কেউ এই সব অস্ত্র দিয়ে দেবতার উদ্দেশে বলি দিতে আসেন তো কেউ বা আবার দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্র প্রদর্শন করে বীরত্ব দেখাতে। তাই এই দিনে বদলে যায় পরিচিত গ্রামের ছবিটা। অন্যান্য প্রচলিত মেলার চেয়ে গ্রামীণ এই মেলা অনেকটাই আলাদা। শহুরে যান্ত্রিক প্রভাব আজও থাবা বসাতে পারেনি এখানে। মন্দির বলতে একটি খড়ের চালাঘর। যার মেঝেটি আজও মাটির।

বাংলায় ধর্মপুজো প্রসঙ্গে প্রখ্যাত গবেষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘যখন সহজিয়া ধর্মের প্রাদুর্ভাবে বাঙালি একেবারে অকর্মণ্য ও নির্বীর্য হইয়া গিয়াছিল, ঠিক সেই সময় আফগানিস্তানের খিলজিরা আসিয়া উহাদের সমস্ত বিহার ভাঙিয়া দিল— দেবমূর্তি, বিশেষত যুগলাদ্য মূর্তি চূর্ণ করিয়া দিল— সহস্র সহস্র নেড়া ভিক্ষুর প্রাণনাশ করিল।…মুসলমান বিজয়ে বৌদ্ধ-মন্দিরের ও বৌদ্ধ-দর্শনের একেবারে সর্বনাশ হইয়া গেল।…বৌদ্ধধর্মের প্রাদুর্ভাবকালে যাহারা অনাচরণীয় ছিল এবং মুসলমানাধিকারের পরে নতুন সমাজে যাহারা অনাচরণীয় হইল— বৌদ্ধধর্ম শেষে তাহাদের মধ্য নিবদ্ধ হইয়া পড়িল এবং তাঁহারা ক্রমে প্রজ্ঞা, উপায় ও বোধিসত্ত্ব ভুলিয়া গেল। শূন্যবাদ, বিজ্ঞানবাদ, করুণাবাদ ভুলিয়া গেল; দর্শন ভুলিয়া গেল। তখন রহিল জনকতক ভিক্ষু অথবা ভিক্ষু নামধারী বিবাহিত পুরহিত। তাহারা আপনার মতো করিয়া বৌদ্ধধর্ম গড়িয়া লইল। তাহারা কূর্মরূপী এক ধর্মঠাকুর বাহির করিল। এই যে কূর্মরূপ ইহা আর কিছু নহে, স্তূপের আকার।…সুতরাং কূর্মরূপী ধর্ম আর স্তূপরূপী ধর্ম একই। পঞ্চবুদ্ধের প্রত্যেকের যেমন একটি করিয়া শক্তি ছিল। ধর্মঠাকুরেরও তেমন একটি শক্তি হইলেন, তাঁহার নাম কামিণ্যা।…ধর্মঠাকুর আজও যে বাঁচিয়া আছেন, সে কেবল মানতের জোরে। নদীয়ার উত্তর জামালপুরের ধর্মঠাকুরের মন্দিরে বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে বারোশত পাঁঠা পড়ে।’

অঞ্চল সমীক্ষা করে এবং ঐতিহাসিক গবেষকদের বর্ণনা পড়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়, ও তার পরবর্তীকালে ডঃ সুকুমার সেন ,নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখের বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়েছে।বলা যায় নবদ্বীপে ডন্ডপানিতলার শিব মন্দিরটি হেটমুন্ডু দন্ডপাণী শিব নামে পরিচিত যার নামের সঙ্গে বৌদ্ধ সংস্কৃতির যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায়
। এছাড়া নবদ্বীপের পূর্বপ্রানতে পারডাঙ্গাঅঞ্চলে বেশ কিছু কূর্ম আকৃতি মূর্তি, যোগনাথ তলা ও অন্যান্য শিবমন্দির গুলোতে শিবের আকারে পূজা পাচ্ছেন।

বাংলার অন্যান্য জায়গার ধর্মরাজের বিগ্রহ কূর্মাকৃতি হলেও জামালপুরে বুড়োরাজের বিগ্রহ কিন্তু দু’টি গৌরীপট্ট যুক্ত একটি মূর্তি। তার এক দিকে শিবলিঙ্গ অপর দিকে একটি গর্ত। মাটির কিছুটা নীচে থাকায় এর চেয়ে বেশি বোঝা যায় না। মন্দিরের এক সেবায়েৎ জানালেন, আনুমানিক ছ’শো বছর আগে এই অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলে ছিল একটি উইয়ের ঢিপি। শোনা যায়, প্রতি দিন একটি গাই সেই উইয়ের ঢিপির উপর এসে দাঁড়াত। আর আপনা থেকেই উইয়ের ঢিপির উপরে দুধ পড়ত। সেই গরুর মালিক যদু ঘোষ এক দিন তার পিছু নিয়ে এই আশ্চর্য ঘটনা দেখে আবাক হয়েছিলেন। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, ওখানেই দেবতার অধিষ্ঠান। পর দিন সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে শিবলিঙ্গ-গৌরীপট্ট সমেত পাথরের অদ্ভুত এক বিগ্রহ পাওয়া যায়। কিন্তু, হাজার চেষ্টা করেও সেই বিগ্রহের শেষ পাওয়া যায়নি বলে সেটি সরানো সম্ভব হয়নি।

সে দিন রাতে যদু ঘোষ ফের এবং ওই গ্রামের এক ব্রাহ্মণ মধুসূদন চট্টোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশ পান যে, সেই বিগ্রহটিকে ওই স্থান থেকে সরানো অসম্ভব। তাই সেখানেই তাঁকে প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করতে চান। কিন্তু, গরিব সেই ব্রাহ্মণের পক্ষে নিত্যপুজোর ব্যয়ভার গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। তখন আবারও তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে প্রতি দিন তিন সের চাল আর দুধ দিয়ে পুজো করলেই হবে। সেই থেকে প্রতি দিন একটি থালায় তিন সের চালের নৈবেদ্য দিয়ে পুজো হয়। আর মাঝখানে একটা দাগ দেওয়া হয়। একাংশ শিবের উদ্দেশ্যে আর এক অংশ যম-ধর্মরাজের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। তবে, বিশেষ তিথিতে পরমান্ন ভোগ হয়। জামালপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিগ্রহটি বৌদ্ধ যুগের। মূলত অনার্য এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধনেই নাকি বাংলায় ধর্মপুজোর প্রচলন ঘটেছিল।
প্রচলিত কাহিনি অনুসারে সেই ব্রাহ্মণ যে দিন স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন সে দিন ছিল বুদ্ধপূর্ণিমা। তাই, প্রতি বছর সেই দিনটিতে এখানে বসে মেলা। আজও বুদ্ধপূর্ণিমায় এখানে অসংখ্য পাঁঠা ও ভেড়া বলি হয়। মাঝেমধ্যেই বলির পাঁঠার ভাগ নিয়ে কিংবা কে আগে বলি দেবে তা নিয়ে মারামারিও বেধে যায় অস্ত্রধারীদের মধ্যে। হঠাৎই যেন ভেসে ওঠে আদিম সমাজের ছবি। মন্দিরের এক সেবায়েৎ বলছিলেন, যম-ধর্মরাজের উদ্দেশ্যেই এই বলিদান। বিপদে পড়ে কিংবা কোনও গভীর সমস্যা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ দেবতার কাছে কিছু মানত করে। বিপন্মুক্ত হলে তারা দেবতার উদ্দেশে পশুবলি দেয়।

তবে, বাংলার অন্যান্য মেলায় অবক্ষয়ের ছবি দেখা গেলেও এখানে আজও দেখা যায় মেলার সাবেক ছবিটা। মেলা চলে মাসখানেক। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি অস্থায়ী দোকানও হয় এখানে। দোকানিরা আসেন কলকাতা, শান্তিপুর, নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ, বর্ধমান, কাটোয়া, কালনা থেকে। এখানে কেউ আসেন ভক্তিতে, কেউ বা মেলার আকর্ষণে। ‘বুড়োরাজের জয়’ ধ্বনি মুখরিত আকাশ বাতাস পরিবেশও যেন ভক্তদের মনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আজও সরল মানুষের বিশ্বাস বুড়োরাজের দরবারে এসে বোবার মুখে কথা ফোটে, দৃষ্টিহীন দৃষ্টি ফিরে পায়, দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় হয় কিংবা নিঃসন্তান সন্তানসম্ভবা হয়। আর সেই বিশ্বাস নিয়ে শ্রেণি-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ এই সময় সন্ন্যাস পালন করেন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের সরল ধর্মীয় বিশ্বাস আর লৌকিক কিংবদন্তির মাঝে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল জামালপুরের বুড়োরাজ।

তথ্যঃ বুড়োরাজের মেলা : বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য

কলমে – প্রজ্ঞাজ্যোতি দেবনাথ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *